10/06/2026
✋ ঘটেছিল একাত্তরে ✋
(শ্রদ্ধেয় মাহবুব কামাল লিখেছেন একাত্তরে তাঁর পরিবারের একটি স্মৃতি। মূল লেখার লিঙ্ক - https://www.facebook.com/share/p/1HMnQM24gG/ )
একাত্তরের একটি স্মৃতি
একাত্তরের হলেও এটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নয়। আব্বা তখন কুমিল্লায় কেটিসিসিএএর ভাইস চেয়ারম্যান। রানীর বাজারের মূল রাস্তা থেকে একটু ভিতরে এক বিরাট বাড়ির নিচতলায় আমরা ভাড়া থাকি।
১৯৭১ সালের মার্চের ২৮ কি ২৯ তারিখ। আমি তখন ক্লাস টেনের ছাত্র। পাক হানাদার বাহিনী বাঙালিদের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, মুক্তিযুদ্ধ তখনও সেভাবে দানা বাঁধতে পারে নি। একটি বড়োসড়ো পুকুরের প্রায় পুরো পশ্চিমপাড় জুড়ে আমাদের বাসার কম্পাউন্ড। আমাদের বাসার ঠিক উত্তরে ক্ষুদ্র পরিসরে ফয়জুন্নেসা কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ, ঠিক পাশে বাড়িওয়ালা নিজে থাকেন ছোট একটি ঘরে, পিছে দুই রুমের আরো একটি ছোট বাড়ি বানিয়ে এক পরিবারকে ভাড়া দিয়েছেন।
উত্তরপাড়ে এবং পূর্বপাড়ে ছোট ছোট বাড়ি, দক্ষিণদিকে পায়ের সরু পথ পেরিয়ে আরেকটি পুকুর। উত্তরপাড়ের কয়েক পা দূরে এক ছোট বাড়িতে হঠাৎ করেই আলসার বার্স্ট হয়ে মারা গেলেন এক তরুণ ভদ্রলোক। সীতাকুণ্ডের এক মুসলিম জমিদার পরিবারের সন্তান কুমিল্লায় কন্ট্রাক্টরি করতে এসে প্রেমে পড়লেন এক ব্রাহ্মণ-কন্যার।
টেলিফোন অপারেটর মায়া'দিকে বিয়ের কারণে বংশগর্বে গর্বিত পিতা চৌধুরীভাইকে সম্পত্তি থেকে ত্যাজ্য করলেন। তিনি তখন থেকেই দরিদ্র শ্বশুরের আশ্রয়ে থাকতেন। তাঁর মৃত্যুর পরে খবর পেয়ে আম্মা ওযু করে কোরান শরীফ চাদরে মুড়ে আমাকে সাথে করে গেলেন। আম্মার নির্দেশে আমিও ওযু করে নিলাম। আমাদের বাসা মূল রাস্তা থেকে কিছুটা ভিতরে, পাকিস্তান আর্মি তখনও ভিতরে আসতো না। ভিতরে যাওয়ার পরে দেখি মায়া'দি ধুলোয় লুটচ্ছেন, তাঁর মা বাবা মিলে তাকে সান্তনা দিচ্ছেন। আম্মা মায়া'দিকে ধরে উঠিয়ে চোখ মুছিয়ে বললেন, ‘শব্দ করে কাঁদলে মৃতের অমঙ্গল হয়’।
মায়া'দির মা বললেন, ‘দিদিগো দোয়া পড়েন। আমার মাইয়াডার লাইগা হে সব বিসর্জন দিছে, ভগবান য্যান হ্যারে স্বর্গে আশ্রয় দ্যান। মায়ারে আশীর্বাদ করেন, 'হ্যায় য্যান জীবনে কষ্ট কইরা হইলেও চলতে পারে।’ আম্মা ঘোমটামাথায় অশ্রুসিক্ত চোখে মৃতের শিয়রে সূরা ইয়াসিন পড়া শুরু করলেন। পাশে দাঁড়িয়ে কপালে জোড়হাত ঠেকিয়ে অশ্রুবিসর্জন করে চলেছেন দুই রমণী, একজনের কপালে সিঁদুর, একজনের কপালে মুছে ফেলা সিঁদুরের হালকা রেশ তখনও রয়ে গেছে। ঘরজুড়ে ধূপের গন্ধ।
চারটার দিকে ঠাকুরপাড়ার বিখ্যাত খান পরিবারের (আওয়ামী লীগ নেতা আফজল খান এই পরিবারের) কয়েকজন এক মৌলভি সাহেবকে সঙ্গে করে এসে মৃতদেহ উঠানে নিয়ে গেলেন। গোসল করিয়ে, কাফন পরিয়ে নিয়ে যাবেন, দাফন করা হবে তাঁদেরই পারিবারিক গোরস্থানে। আম্মা কোরান শরীফ পড়েই যাচ্ছেন। মৃতদেহ কাঁধে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময়ে মায়া'দি দৌড়ে গিয়ে ‘আমারেও লইয়া যাও’ বলে আর্তনাদ করে মাটিতে আছড়ে পড়লেন।
আম্মা কোরান শরীফ আমার হাতে দিয়ে মায়া'দিকে উঠিয়ে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বোলাতে লাগলেন। মায়া'দির মা এসে উভয়কে জড়িয়ে ধরলেন। উঠানে দাঁড়িয়ে জড়াজড়ি করে তিন অশ্রুসিক্ত রমণী, পাশে দাঁড়িয়ে মায়া'দির শোকাহত বাবা বিড়বিড় করে কোনো মন্ত্র পড়ছেন। আম্মা কোনো একটি দোয়া পড়ে মায়াদির মাথায় ফুঁ দিলেন। একটু পরে আমি মনে করিয়ে দিলাম কারফিউ শুরু হতে আর দেরি নেই।
সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই, এটিই পরম সত্য।
👉আমার এক ফেসবুক বন্ধুর সৌজন্যে মায়া'দির পরবর্তী জীবনের কিছু তথ্য জানতে পেরেছিলাম। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মানুষের জীবন থেমে থাকে না, মায়া'দির জীবনও চলমান ছিল।
👉 গত অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে বিরাট জনগোষ্ঠীর মনোজগতে এক মারাত্মক পরিবর্তন হয়ে গেছে আঞ্চলিক আর্থসামাজিক প্রভাবে। চন্ডিদাস, শেখ সাদি, হাফিজ, রুমি, লালন, নজরুল, সত্যেন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথকে পিছে সরিয়ে বিপুল জনগোষ্ঠীর মনোজগৎ দখল করে নিয়েছে ইবনে তাইমিয়াহ, হাসান বান্নার হিংস্র মানবিকতা-বিরোধী ফ্যাসিস্ট-ধারার সালাফি দর্শন।
এর সুযোগ নিচ্ছে এক শ্রেণীর অর্থলোভী, স্বার্থপর, প্রতিহিংসা পরায়ন ব্যক্তিরা যারা আসলে নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছুই বুঝে না। সেইজন্যই তাদের প্রতিনিধি নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করতে পারে রিসেট বাটন দাবানোর কথা। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রটি আমরা হারিয়ে ফেলেছি এইসব প্রতারকদের ষড়যন্তের কারণে। অবশ্য পৃথিবীতে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়, মুশকিল হলো পুনর্নির্মাণ খুবই কঠিন, ধ্বংস করা সহজ।
✋ আমার মায়ের এই ছবিটি আমার জন্মের কয়েক বছর আগের একটি পারিবারিক ফটোগ্রাফ থেকে কেটে নেওয়া। ঝাপসা হয়ে আসা ছবিটি চ্যাটজিপিটির সাহায্যে কিছুটা স্পষ্ট করে নিয়েছি।