West Bengal Industry

West Bengal Industry All about history of De-industrialization of west Bengal.

বন্ধ কারখানায় স্তব্ধ কোচবিহারের সমৃদ্ধির স্বপ্ননমিতেশ ঘোষবাণিজ্যে বাস করেন লক্ষ্মী। কোচবিহারের রাজবাড়ির লক্ষ্মীশ্রী ম্লা...
25/11/2021

বন্ধ কারখানায় স্তব্ধ কোচবিহারের সমৃদ্ধির স্বপ্ন
নমিতেশ ঘোষ
বাণিজ্যে বাস করেন লক্ষ্মী। কোচবিহারের রাজবাড়ির লক্ষ্মীশ্রী ম্লান হয়ে এলে, নতুন শিল্পকেন্দ্রকে ঘিরে ফের শ্রী ফিরে পেতে চেয়েছিল এককালের ‘রাজনগর।’

একটা সময়ে ‘রাজনগর’ কোচবিহার কতটা জমজমাট ছিল তা নিয়ে রাজ আমলের নানা প্রামাণ্য নথি রয়েছে। রাজার আমল যাওয়ার পরে শহরের কৌলিন্যও যেন ধীরে ধীরে হারাচ্ছে। বাম আমলে শহরের উপকণ্ঠে চকচকা এলাকায় যে শিল্পকেন্দ্র গড়ে ওঠে তা নিয়ে ফের ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিল কোচবিহার। কিন্তু, বাম-জমানায় গোড়াতেই তা হোঁচট খেল। চকচকায় ঠিকঠাক পরিকাঠামো তৈরি হল না। রাস্তাঘাট, পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, জল-সহ নানা সমস্যা মেটানো নিয়ে টালবাহানায় জেরবার হলেন উদ্যোগীদের অনেকে। ফলে, যেখানে ৬৫টি কারখানা গড়ে উঠেছিল তার অনেকগুলিই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এখন ৪৮টি মাঝারি, ছোট মাপের কারখানা চলছে। তাও শিল্পোদ্যোগীরা নানা ঝঞ্ঝাটে জেরবার।
একটু অতীতে চোখ ফেরানো যাক। কৃষি নির্ভর কোচবিহারে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে বাম জমানায় কোচবিহারে শিল্পকেন্দ্র গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ২০০১ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের উদ্যোগে শহর লাগোয়া চকচকায় শিল্পকেন্দ্রটি চালু হয়। খোদ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সেই সময় ১২টি কারখানার শিলান্যাস করেন। ৭২ একর জমির ওপর তৈরি ওই এলাকায় কয়েক বছরের মধ্যে রাইস মিল, হাসকিং মিল, প্লাস্টিক সামগ্রী, খাতা তৈরি, সরষের তেলের মিল, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, পাটজাত ও তুলোজাত সামগ্রী, বিস্কুট, মশারি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম তৈরি-সহ মোট ৬৫টি কারখানা তৈরি হয়। যার মধ্যে একটি একটি করে অন্তত ১৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে রয়েছে। ওই তালিকায় থাকা মশারি তৈরির কারখানাটি পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ হয়ে রয়েছে। তুলোজাত সামগ্রী, বিস্কুট, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বিভিন্ন কারখানাগুলির এমন অবস্থাও দীর্ঘদিনের। বেশ কিছু বন্ধ কারখানার ঘর, অন্য পরিকাঠামো গুদাম ঘরে পরিণত হয়েছে। রাজ্য শিল্প উন্নয়ন নিগমের তরফে সমস্যা খতিয়ে দেখে ওই সব বন্ধ কারখানা নতুন করে চালুর ব্যাপারে সেভাবে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।
কিছুদিন আগে কোচবিহার জেলা প্রশাসনের তরফে বৈঠক করে চকচকার সামগ্রিক অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে কারখানার নামে জমি আটকে রাখার প্রবণতা বন্ধে কড়া মনোভাবের কথা বুঝিয়ে দেন প্রশাসনের কর্তারা। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই বৈঠকে দীর্ঘদিন ধরে শিল্পকেন্দ্র চত্বরে বন্ধ পড়ে থাকা কারখানা চালু না করা হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার লিজ বাতিল করে জমি ফেরত নেওয়ার ব্যাপারে সওয়াল করেন প্রশাসনের পদস্থ কর্তারা। তবে তার আগে বন্ধ কারখানা কর্তাদের অবশ্য সুযোগ দিতে চাইছেন তারা। শিল্প নিগমের কর্তাদের বন্ধ কারখানা কর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা খতিয়ে দেখে দ্রুত সেগুলি চালুর ব্যাপারে উসাহ বাড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এর পর নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। কাজ না হলে কিংবা কোনও সংস্থা বন্ধ কারখানা খোলার ব্যাপারে উদাসীনতা দেখালে নিয়মমাফিক আইনি নোটিস পাঠিয়ে জমির লিজ বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। কোচবিহারের জেলাশাসক পি উল্গানাথন বলেন, বন্ধ কারখানা চালু না করে জমি আটকে রাখা যাবে না।
কেন এমন পরিস্থিতি? চকচকার শিল্পোদ্যোগী ও ব্যবসায়ী সংগঠন কর্তাদের বক্তব্য, প্রথমত উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে শিল্পোদ্যোগীরা কর ছাড়ের সুযোগ পান। উত্তরবঙ্গে সেই সুযোগ নেই। ওই ব্যাপারে কেন্দ্রের কাছে দরবার করেও লাভ হয়নি। চকচকা শিল্পকেন্দ্রের সঙ্গে ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক সংযোগকারী রাস্তার বেহাল দশা। সন্ধ্যের পর শিল্পকেন্দ্র চত্বরের বেশির ভাগ পথবাতি মাঝেমধ্যে বিকল হয়ে থাকছে। নিকাশির অবস্থা আরও খারাপ। সামান্য বৃষ্টিতে জলে ভাসে গোটা চত্বর। তার উপরে রয়েছে লোডশেডিং ও লো ভোল্টেজের সমস্যাও।
নিরাপত্তা নিয়েও ক্ষোভ কম নয়। বারবার দরবার করেও সেখানে পুলিশ পিকেটের দাবি পূরণ হয়নি। অসমের অশান্তি থেকে উত্তরবঙ্গ ঘিরে নানা বিক্ষিপ্ত আন্দোলন জনিত সমস্যাও উপাদিত সামগ্রী বিক্রির বাজারের ওপর প্রভাব ফেলছে। কোচবিহারের বাজার দখল করেছে অন্যত্র উৎপাদিত সামগ্রী। তার ওপর এতদিনেও গোটা শিল্পকেন্দ্রে কোনও বৃহৎ শিল্প গড়ে ওঠেনি। একটি মাঝারি ছাড়া সবই ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র। এমনকী, জুট পার্কের জন্য ২০০৭ সালে সরকারি ভাবে সিদ্ধান্ত হলেও কাজ হয়নি। অথচ জেলায় দেদার পাট উপাদন হয়। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি চটজাত সামগ্রী তৈরিতে কাঁচামালের অভাব হতো না। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ত। কিন্তু উদ্যোগটা কোথায়? কোচবিহার ডিস্ট্রিক্ট ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল ওয়েলফেয়ার আসোসিয়েশনের সভাপতি সুকুমার সাহা বলেন, “পরিকাঠামো হয়নি। উড়ান বন্ধ। কেন্দ্র কর ছাড়ের সুযোগ দিচ্ছে না। এ সব নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। কাজের কাজ করতে হবে।”

বাণিজ্যে বাস করেন লক্ষ্মী। কোচবিহারের রাজবাড়ির লক্ষ্মীশ্রী ম্লান হয়ে এলে, নতুন শিল্পকেন্দ্রকে ঘিরে ফের শ্রী ফি.....

পশ্চিমবঙ্গ : বামপন্থা ও শ্রমিক দিবসমুখ্যমন্ত্রীর আসনে থাকাকালীন কমঃ জ্যোতি বসু (Jyoti Basu) এক শিল্পপতির ঘেরাও আন্দোলন ত...
25/11/2021

পশ্চিমবঙ্গ : বামপন্থা ও শ্রমিক দিবস
মুখ্যমন্ত্রীর আসনে থাকাকালীন কমঃ জ্যোতি বসু (Jyoti Basu) এক শিল্পপতির ঘেরাও আন্দোলন তুলে নেওয়ার কাতর আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে বলেছিলেন “Capitalist are class enemies and he should expect no sympathy.” বাম জমানার ঠিক পূর্বে কলকারখানায় কর্ম সংস্থানের নিরিখে যে রাজ্য প্রথম সারিতে ছিল, সেই রাজ্য এখন তালিকায় ১২ নম্বরে। মালিকপক্ষকে শ্রেণী শত্রু ঘোষনা করে ক্রমাগত ঘেরাও এবং হিংসাত্মক আন্দোলনের মাধ্যমে উৎপাদন বন্ধ করে দিয়ে এই বাংলার বুকে যে রাজনৈতিক অশুভ শক্তির উত্থান হয়েছিল তার অবশ্যম্ভাবী ফলস্রুতিতে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়েছিল, বিনিময়ে উল্কার গতিতে বেড়ে উঠেছিল পার্টির সদস্য সংখ্যা।

১৯৬৭ সালে কমঃ জ্যোতি বসু (Jyoti Basu) ডেপুটি চিফ মিনিস্টার হিসাবে শপথ নিলেন এবং রাজনৈতিক ডামাডোলের সুযোগে স্বামী বিবেকানন্দের পরম অনুরাগী মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জি (Ajay Mukherjee) কে কার্যত পাশে সরিয়ে রেখে ডিক্টেটরশিপের অশুভ সূচনা করলেন এই রাজ্যের বুকে। মুখ্যমন্ত্রীর থেকেও অধিক ক্ষমতাবান হয়ে দায়িত্বহীন ক্ষমতা ও বিকৃত রাজনৈতিক আদর্শের অভাবিত মেলবন্ধন একেরপর এক শিল্প বিরোধী নির্বোধ আইন পাস করতে লাগল। ফল স্বরূপ শ্রমিক মালিক সংঘাত নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাড়ালো। রাজ্যজুড়ে ঐ বছরই মোট ১৩৭২ বার ঘেরাও আন্দোলন হল এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের মন এমনভাবে বিষিয়ে দেওয়া হল যে কোথাও একদিন, কোথাও দুই দিন জল ও খাদ্য না দিয়ে মালিকপক্ষ কে আটকে রাখা হল। একটার পর একটা কলকারখানা বন্ধ হওয়া শুরু হল। একটা একটা করে বাম আমলে মোট ৫৬০০০ কারখানা বন্ধ হল। কিছু ছোট কোম্পানী অন্য রাজ্যে বাধ্য হয়ে পালালো। ১৯৬৬ সালে সমগ্র দেশের শিল্প উৎপাদনের ২০.১% যেখানে এই রাজ্যে হত, তা বাম জমানায় কমতে কমতে শেষে ২.৯% এ পৌঁছাল। স্বাভাবিক ফলস্রুতিতেই কোলকাতা বিমানবন্দরে বৈদেশিক বিমান অবতরণ কমতে লাগল। সত্তরের দশকে যেখানে সপ্তাহে ১৮ টি বিমান লন্ডন থেকে কোলকাতায় আসতো, তা কমতে কমতে মাত্র ৮ এ গিয়ে ঠেকল। ধর্মঘট, ঘেরাও থেকে কোলকাতা নদী বন্দরও মুক্তি পেল না। ষাটের দশকে যেখানে ৯.৪ মিলিয়ন টন মাল পরিবহন করে দেশের এক নম্বর বন্দর ছিল, তা রাজনৈতিক হিংস্র আন্দোলনের কারনে সারা দেশের নিরিখে সপ্তমে নেমে আসল। অসংখ্য শ্রমিক কাজ হারালেন। বাংলার আপামর জনতা এই নির্লজ্জ অবিবেচক পুঁজি খেদানোর আন্দোলন চরম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সামনে অসহায় ভাবে দেখতে থাকলেন। ক্রমাগত পুঁজির পলায়ন ও বাজারী ঋণের ফাঁদে পরে শ্রমিক শ্রেণির নাভিশ্বাস উঠল, তাদের ক্রয় ক্ষমতা তলানিতে পৌছালো।১৯৬০-৬১ সালে বাংলা মাথাপিছু ইনকামে সারা দেশে প্রথম স্থানে ছিল, আর আজ ২৩ তম স্থানে। জিডিপির ক্ষেত্রে শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রের শেয়ার ক্রমাগত কমতে কমতে নব্বইয়ের দশকে তলানিতে ঠেকল। জন প্রতি জিডিপি তে আজ আমাদের রাজ্য ২০ তম স্থানে। বাম আমলে ভন্ড শ্রেণি শত্রুতা ও ধ্বংসাত্মক হিংস্রতার মাধ্যমে পুঁজির যে পলায়ন শুরু হয়েছিল, আজ ভ্রান্ত জমি নীতি, তোলাবাজি ও সিন্ডিকেট রাজ সেই কফিনে শেষ পেরেক পুতেছে।

২০২০ এর শ্রমিক দিবসের প্রাক্কালে এই তথ্যগুলি প্রতিটি সচেতন নাগরিকের হৃদয় ভারাক্রান্ত ও অনুশোচনায় বিদ্ধ করে তুলবে, সন্দেহ নেই। পরিশেষে এটা লিখতেই হয়, যে বিকৃত রাজনৈতিক আদর্শ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল শিল্প মাত্রেই শোষণের হাতিয়ার, পুঁজির হাত সর্বদাই কালো আর ধ্বংস করাটাই চরম মোক্ষ, তাদের শ্রমিক দরদী সাজাটা সত্যিই হাস্যকর। ভ্রান্ত দর্শন সম্বল করে কায়েমি স্বার্থে মেকি শ্রেণী শত্রুতার নাম নিয়ে এবং পরবর্তীকালে আদর্শ শূন্য রাজনীতির তোলাবাজি ও সিন্ডিকেট রাজের মাধ্যমে অর্থনীতির মূলভিত্তি ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়ে শ্রমিক সমাজ কে আবশ্যিক ভাবে “রিক্শাই আমাদের ভিত্তি, টোটোই আমাদের ভবিষ্যৎ” এর পথে ঠেলে দেওয়া ভন্ডদের প্রতি শ্রমিক দিবসে রইল একরাশ ঘৃণা।

মুখ্যমন্ত্রীর আসনে থাকাকালীন কমঃ জ্যোতি বসু (Jyoti Basu) এক শিল্পপতির ঘেরাও আন্দোলন তুলে নেওয়ার কাতর আহ্বানের পরিপ্রেক...

25/11/2021

নিভু নিভু শিল্পাঞ্চলে বন্ধ কারখানার সারি

বিতান ভট্টাচার্য ও সৌমিত্র সিকদার

রাজ্য থেকে আজ যখন একের পর এক শিল্প বিদায় নেওয়ার পথে, শিল্পাঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশের প্রথম পর্বে কল্যাণীতে তখন ছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের মেরামতি কারখানা ও গবেষণাগার ‘রেডিও ফ্যাক্টরি’। ১৯৫৪ সালে বি ব্লকে বিশাল এলাকা জুড়ে তৈরি হওয়া সেই রেডিও ওয়ার্কশপ অ্যান্ড রিসার্চ ল্যাবেরটরি এখন দুর্বল পরিকাঠামোর শিকার। প্রজেক্টর, টেলিভিশনের মেরামতি চলে সেখানে। এক সময়ে বিধানচন্দ্র রায়ের উদ্যোগে ১১ বিঘা জমিতে তৈরি হয়েছিল হ্যান্ডমেড পেপার মিলও। বিভিন্ন ধরনের আর্ট পেপার, বোর্ড তৈরি হত। বর্তমানে এটিরও রুগ্ণ অবস্থা।

১৯৬১ সালে ১ এপ্রিল থেকে আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন মাপের সুতো তৈরির লক্ষে তৈরি হয়েছিল কল্যাণী স্পিনিং মিল। প্রথম দিন কারখানা পরিদর্শন করতে এসেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়। একই সময়ে সেন-র‍্যালে সাইকেল, ডেভিডসন ইন্ডিয়া, উড ইন্ড্রাস্ট্রি স্থাপিত হয়। এর পরে ইনচেক টায়ার ফ্যাক্টরি, কল্যাণী ব্রুয়ারিস, কেআর স্টিল, রামস্বরূপ ইন্ডাস্ট্রিয়াল কর্পোরেশন তৈরি হয়েছিল। নানা কারণে সব ক’টি কারখানাই কিছু দিন পরে পরে বন্ধ হয়ে যায়। অথবা কোনও মতে এখনও ধুঁকছে। বড় শিল্পের পাশাপাশি ছিল অনেক ছোট শিল্পও। কল্যাণীর বাসিন্দারাই ব্যক্তি মালিকানায় সে সব গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু মূল শিল্পই যেখানে হোঁচট খাচ্ছে, সেখানে সমস্যায় পড়ছেন তাঁরাও। বেঙ্গল ফের, সোমানি, রাবার ফ্যাক্টরি, অ্যান্ড্রুল ইঞ্জিনিয়ারিং, রূপনারায়ণ পেপার মিল, ইন্ডিয়ান অয়েল, আইএফএলের পাশাপাশি কয়েকটি স্টিল কারখানাও তৈরি হয়েছিল এখানে। কিন্তু দুর্গাপুরের থেকে বিদ্যুতের দাম অনেক বেশি হওয়ায় সমস্যার মুখোমুখি হয় কল্যাণীর স্টিল কারখানাগুলি।

পুরনো শিল্পাঞ্চলের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে প্রবীণ এক শ্রমিক নেতা বলেন, “ইউনিয়নের নেতারা কী করেননি? কর্তৃপক্ষের লোকজনকে মারধর করেছেন। এক শ্রেণির নেতা তোলা আদায় করেছেন। না দিতে চাইলে নানা ভাবে ভয় দেখিয়েছেন। সেই সময়ে অনেক মালিকই আর ভয়ে এ মুখো হননি। দাবি নিয়ে সঠিক ভাবে আলোচনা না করেই ধর্মঘট করেছেন শ্রমিকেরা। এ সমস্ত কারণে বহু কারখানাই বন্ধ হয়েছে।” তিনি জানান, দু’একটি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শুধু আলোচনা করেই তিনি তা খুলতে সক্ষম হয়েছিলেন এক সময়ে।

কল্যাণী শিল্পাঞ্চল নিয়ে কথা হচ্ছিল চার বারের প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক এবং বর্তমানে পিডিএসের রাজ্য সভাপতি সুভাষ বসুর সঙ্গে। সুভাষবাবু বলেন, “১৯৬৫ সাল থেকে এই শহরে থাকি। চোখের সামনে সব কারখানা তৈরি হতে দেখেছি। আবার এক এক করে সব শেষও হতে দেখেছি। এক সময় বড়, মাঝারি, ছোট মিলিয়ে শতাধিক কারখানা ছিল। তার অধিকাংশ আজ বন্ধ। সব মিলিয়ে গোটা পাঁচেক ভাল ভাবে চলছে বলা যায়।” কারখানা বন্ধের পেছনে প্রবীণ শ্রমিক নেতার বক্তব্য কার্যত স্বীকার করে নিয়ে তিনি বলেন, “সব সময়ে শ্রমিকদের বলতাম, উত্‌পাদন বাড়াতে হবে। অধিকাংশ নেতা ঠিক মতো কাজ করতেন না। কাজ না করে শুধু বেতন নিয়েই বাড়ি ফিরতেন। কারখানার ভিত হতে না হতেই সেখানে ঝাণ্ডা পুতে দিতেন। কর্তৃপক্ষের কাছে নিজেদের লোক নেওয়ার দাবি জানাতেন। এ সবে মালিকেরা ভয় পেয়ে কারখানা না করেই ফিরে যেতেন।”

সুভাষবাবু আরও প্রশ্ন তোলেন, “রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বলছেন কারও কাছ থেকে জমি নেবেন না। তাহলে, কল্যাণীতে কারখানা করার জন্য যাঁরা জমি নিয়েও কারখানা করেননি, আইন করে তাঁদের সেই জমি ফিরিয়ে দেওয়া হোক। সেখানে নতুন করে কারখানা তৈরি হোক। কারখানা না হলে বেকার সমস্যার তো সমাধান হবে না।” ওই শ্রমিক নেতাও বলেন, “বন্ধ কারখানা এক এক সমাজবিরোধীদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। মেশিন-পত্র বিক্রি করে দেয় দুষ্কৃতীরা।”

এক সময় বেশ কিছু কারখানায় তিনটি বিভাগেই কাজ হয়েছে। অনেক কারখানায় শ্রমিকরা ওভার টাইম করতেন। কল্যাণী ছাড়াও নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা ও হুগলি জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে শ্রমিকেরা এখানে কাজ করতে আসতেন। বেশ কিছু বাস কল্যাণী মেন স্টেশন থেকে শ্রমিকদের কারখানায় নিয়ে আসার জন্য বহাল ছিল তখন। আপ ও ডাউনের ট্রেন থেকে দলে-দলে শ্রমিকরা কল্যাণী মেন স্টেশনে নামতেন। আজ সে সব দৃশ্য অতীত। শিল্পাঞ্চল মানেই বিশ্বকর্মা পুজো। ওই সময়ে প্রতি বছর কারখানাগুলো গমগম করত। চারদিকে আলো, প্যাণ্ডেল মাইকের শব্দ, হইচইয়ে ভরে উঠত গোটা শিল্পাঞ্চল। পুজোকে ঘিরে নাটক, কলকাতার বড় দলের যাত্রা, স্থানীয় ও বহিরাগত শিল্পীদের নিয়ে বিচিত্রানুষ্ঠানে মেতে থাকতেন শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের লোকেরা। সঙ্গে থাকত খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন। আনন্দ ভাগ করে নিতে বিভিন্ন জেলা থকে আসতেন অন্যান্য মানুষজনও।

কল্যাণী শিল্পাঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সিপিএম ও তৃণমূলকেই দায়ী করে কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিইউসি। সংগঠনের জেলা সভাপতি শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় বলেন, “বিধানচন্দ্র রায়ের হাতে তৈরি কল্যাণী শিল্পাঞ্চল বামফ্রন্টের আমলে শেষ হয়ে গিয়েছে। নতুন সরকারেরও এ ব্যাপারে কোনও হেলদোল নেই।” তিনি বলেন, “মানস ভুঁইয়া রাজ্যের ক্ষুদ্র শিল্প দফতরের মন্ত্রী থাকার সময়ে স্পিনিং মিলকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। বেশ খানিকটা কাজও এগিয়েছিল। কিন্তু আমরা সরকার থেকে যাওয়ার পরে আর কিছুই হয়নি।”

বছর তিনেক আগে প্রদীপকুমার শূর কল্যাণীর পুরপ্রধান থাকার সময়ে শহরের বিভিন্ন কারখানার কতৃপক্ষকে নিয়ে ঋত্বিক সদনের সেমিনার হলে একটি সভা করেছিলেন। সেখানে জেলা শিল্প কেন্দ্রের আধিকারিক, বিভিন্ন ব্যাঙ্কের প্রতিনিধি, এস্টেট ম্যানেজার-সহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন। কারখানা কর্তৃপক্ষ তাঁদের সমস্যার কথা তুলে ধরেছিলেন। সে দিন পানীয় জল, রাস্তা-সহ পুরসভার বিষয়গুলি প্রদীপবাবু দেখার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তৃণমূল প্রভাবিত রাজ্য সরকারি কর্মচারী ফেডারেশনের নেতা মনোজ চক্রবর্তী বলেন, “বামফ্রন্টের নীতির কারনে আজ কল্যাণী শিল্পাঞ্চলের এই অবস্থা। শিল্প বজায় রাখার পরিবেশ ওরা শেষ করে দেয়। যে কারণে ৯০টির বেশি কারখানার মধ্যে ৯টি কারখানার চিমনি দিয়েও আজ ধোঁয়া বেরোয় না। এক কালে ৪০ হাজার শ্রমিক কাজ করলেও আজ তার ২০ ভাগও আছেন কিনা সন্দেহ।” তিনি দাবি করেন, তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে যে সব কারখানা চলছে, সেগুলিকে অন্তত টিঁকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। পরিকাঠামোর উপরেও জোর দিচ্ছে সরকার।

https://www.anandabazar.com/west-bengal/nadia-murshidabad/%E0%A6%A8-%E0%A6%AD-%E0%A6%A8-%E0%A6%AD-%E0%A6%B6-%E0%A6%B2-%E0%A6%AA-%E0%A6%9E-%E0%A6%9A%E0%A6%B2-%E0%A6%AC%E0%A6%A8-%E0%A6%A7-%E0%A6%95-%E0%A6%B0%E0%A6%96-%E0%A6%A8-%E0%A6%B0-%E0%A6%B8-%E0%A6%B0-1.105614

অনুজ্জ্বল মে দিবস, ধ্বস্ত শ্রমিকঅনিমিত্র চক্রবর্তী: কোলে বিস্কুট। এই নামটির সঙ্গে বর্তমান বাঙালির পরিচয় না থাকলেও, একসময়...
25/11/2021

অনুজ্জ্বল মে দিবস, ধ্বস্ত শ্রমিক
অনিমিত্র চক্রবর্তী: কোলে বিস্কুট। এই নামটির সঙ্গে বর্তমান বাঙালির পরিচয় না থাকলেও, একসময় তার সঙ্গে ওতপ্রোত পরিচয় ছিল। প্রায় এমন কোনও পরিবার ছিল না তখন যাঁরা চায়ের সঙ্গে কোলে বিস্কুট পছন্দ করতেন না। প্রধান দুটি কারণ তার – দাম সাধ্যের মধ্যে, স্বাদেও অতুলনীয়। এককালের কংগ্রেসী নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শ্রী জগন্নাথ কোলের এই ব্যবসার দাপটে বহুজাতিক কোম্পানির বিস্কুট বাজার দখল করতে পারে নি। স্বয়ং মহানায়ক উত্তমকুমারও এই একটিমাত্র বিস্কুটের বিজ্ঞাপনেই কাজ করেছিলেন। কিন্তু এরও ঝাঁপ বন্ধ হল ১৯৮০ সালের ১৭ অক্টোবর, দুর্গা পুজোর সময়, লকআউট ঘোষণা হল। বহু টানাপোড়েন হল, প্রতি মে দিবসে মুঠ করে শপথ নেওয়া শ্রমিকের মনে আশা জাগে যে এই বুঝি কারখানা খুলবে। তার আধপেটা সংসারের অবস্থা ক্রমশ সিকিপেটাতে এসে ঠেকেছে। ইতিমধ্যে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক কোলে বিস্কুট শ্রমিক-কর্মচারী সমিতির বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার আবেদন মঞ্জুর হয় হাইকোর্টে , ২১ এপ্রিল, ১৯৯৫ সালে।

১৯৯৭ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু কারখানার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনও করেন, কিন্তু তার কয়েকদিনের মধ্যেই জিসিজিএসএ (Greater Calcutta Gas Supply Authority), পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি সংস্থা, কোলে বিস্কুটকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয় যার দরুণ কোম্পানির ব্যবসায়িক উৎপাদন প্রথমে ব্যাহত ও শেষাবধি বন্ধ হয়ে যায়। আর তালা খোলেনি। বাঙালির শ্রম – পুঁজি – শ্রমিকের অপমৃত্যু ঘটে।
একসময়ের সুবিখ্যাত মোহিনী মিলের অবস্থাও তথৈবচ।

১৯০৮ সালে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে আদ্যন্ত স্বদেশী শ্রী মোহিনীমোহন চক্রবর্তী কুষ্টিয়া মোহিনী মিলস এন্ড কোম্পানি লিমিটেড নামক একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। আর একটি ইউনিট স্থাপন করেন (বর্তমান) উত্তর চব্বিশ পরগনার অবস্থিত বেলঘরিয়া অঞ্চলে। মূলত পেশাগত দক্ষতা ও ব্যবসায়িক নৈপূণ্যের দরুন সমগ্র এশিয়ায় মোহিনী মিল শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। কিন্তু ৬০-এর দশকের জঙ্গী বামপন্থী আন্দোলনের দৌলতে ঘনিয়ে আসে তার কাল। ৭০ র দশকের শুরুতে নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রমত্ততার দরুণ মিল বন্ধ থাকে বেশ কিছুদিন ও ক্রমশ তা আপন বাজার হারিয়ে ফেলে।

২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর তদানীন্তন বামফ্রন্ট সরকার হস্তক্ষেপ করেন, সমস্ত মিল চত্বরে নোটিশ দেওয়া হয় যে রাজ্য সরকার মোহিনী মিলকে অধিগ্রহণ করেছেন। কিন্তু ওই পর্যন্তই, ক্ষণিকের জন্য আশান্বিত কর্মচারীরা ফের হতাশায় ডুবে যান কারণ সরকার মিলের পুনরুজ্জীবনের জন্য কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন না। আজ মোহিনী মিল একটি খণ্ডহরে পরিণত হয়েছে। এবং উপরিউক্ত দুটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানই নয়, অসংখ্য। বামপন্থীদের সৌজন্যে পশ্চিমবঙ্গে মে দিবস পালনের কলেরব ৩৪ বছরে বৃদ্ধি পেলেও পাল্লা দিয়ে বন্ধ হয়েছে কারখানা, শ্রমিকের ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে।

১৯৪৭ এ স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরের ১০/১৫ বছর পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের শিল্পে সবচেয়ে অগ্রসর রাজ্য হিসেবে মনে করা হত। ১৯৬৩ সালে সমগ্র ভারতের রেজিস্টার্ড শিল্পদ্বারা আয়ের ২৩.১% র উৎস ছিল পশ্চিমবঙ্গ। ১৯৫৯ সালে এই অংশ ছিল ২২.২% । ‘৬৩ র পর থেকে প্রথমে ধীর গতিতে, পরে দ্রুতভাবে অংশটি কমতে থাকে। ৭০ র দশকের মধ্যভাগে তা ১০.২৪% থাকলেও ১৯৮৭-৮৮ সালে তা ৭.২% হয়। বর্তমানে তা ৭.৯% এ ঘোরাফেরা করছে।

অবশ্যই বামফ্রন্ট আমলে বন্ধ হওয়া কারখানা এবং যা বর্তমান তৃণমূল আমলেও একই স্থানে পরে আছে তার বেদনা কে অনুভব করতে গেছে!! পাঠকের সুবিধার্থে বন্ধ হয়ে যাওয়া অথচ এক সময়ের অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত শিল্প প্রতিষ্ঠানের নামগুলি স্মরণ করা প্রয়োজন।
ন্যাশনাল ট্যানারি, ইস্টার্ন পেপার মিল, ডানবর কটন মিল, বেঙ্গল ল্যাম্প, সুলেখা, উষা, বাসন্তী কটন মিল, বঙ্গোদয় কটন মিল, বেণী লিমিটেড, জয় ইঞ্জিনিয়ারিং সহ অসংখ্য একদা লাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সমর্থিত ও অসমর্থিত সূত্র অনুযায়ী, সমগ্র বাংলায় প্রায় ৫৮,০০০ কল-কারখানা বন্ধ তবুও প্রথামতো পশ্চিমবঙ্গকে দেশের মধ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের শ্রেষ্ঠ গন্তব্যস্থলে পরিণত করার শপথ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে হয় না কোন কিছুই। পড়ে থাকে শুধু হাস্যকর প্রতিশ্রুতি।

অ্যালুমুনিয়াম ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি – লকআউট ১৯৯৮৫ সালে, ইস্টার্ন পেপার মিল- বন্ধ ১৯৮ সালে, সিদ্ধার্থ অ্যাপারেল – বন্ধ ২০০২ সালে। কলকাতার পূর্বপ্রান্তে বেলেঘাটার দক্ষিণ থেকে ট্যাংরা, তিলজলা, তপসিয়া- টায়ার কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া -একসময়ে কাজ করতেন ৪,৫০০ শ্রমিক। বেঙ্গল পটারী- কাজ করতেন ৪,৯০০ জন। ভারত ব্রেকস এন্ড ভাল্বস। স্মিথ স্ট্যানিস্টিট -৯৯০০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। ইলেক্ট্ৰিলা ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির বেলেঘাটা ডিভিশনে নিযুক্ত ছিলেন ১,৮০০ কর্মচারী। সায়েন্টিফিক ইন্ডিয়ান গ্লাস কোম্পানি।
বার্যা কপুর ট্রাঙ্ক রোড ধরে হাঁটলে কামারহাটি, পানিহাটি, খড়দা পুরসভার বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ছিল এক সুবৃহৎ শিল্পাঞ্চল। মূলত, পূর্ব পাকিস্তান থাকে আসা হিন্দু উদ্বাস্তু মানুষদের এক অতি নির্ভরযোগ্য কর্মস্থল ছিল।

১৯৮৫ থেকে পরের দশ বছরের মধ্যেই প্রায় ৮০ শতাংশ কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। বেলঘরিয়া, কামারহাটি, পানিহাটি, সোদপুর, আগড়পাড়া, খড়দহ এলাকার যুব সমাজের অতি চঞ্চল কর্মক্ষেত্র ছিল বাসন্তী কটন মিল, মোহিনী মিল, বঙ্গোদয় কটন মিল, সোদপুরে কটন মিল, বেণী ইঞ্জিনারিং, দীপ্তি হ্যারিকেন ল্যাম্প ফ্যাক্টরি। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী বিহার ও উত্তরপ্রদেশের মানুষজন কাজ করতেন স্থানীয় চটকল, রোলিং মিল, কাগজকলে।

দমদম-লেকটাউন-পাতিপুকুর অঞ্চল প্রসিদ্ধ ছিল তার শিল্পাঞ্চলের কর্মমুখরতার জন্য। অ্যাপোলো জিপার, অ্যামকো, ইস্ট আংলিয়া প্লাস্টিকস, রুবি পেইন্টস, হিন্দুস্থান আয়রন, এআরপি রাবার, নিউল্যাক রাবার, বিজনেস ফার্মস, আশীলা ফার্মাসিউটিসিকেলস, ইএমসি, মোটর মেশিনারি ম্যানুফ্যাকচারিং, পল্ লেহম্যান, ভেগাল ইঞ্জিন এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, সিদ্ধেশ্বরী হোসিয়ারি, বিএমটি মিলস, ইস্টার্ন পেপার মিলস।

যাদবপুর – টালিগঞ্জ – অন্নপূর্ণা গ্লাস, ডাবর, জয় ইঞ্জিনিয়ারিং, সুলেখা ওয়ার্কস, বেঙ্গল ল্যাম্প, কৃষ্ণা গ্লাস, চোপড়া মোটরস, চালিহা রোলিং মিলস।
তারাতলা – হাইড রোড – এক অত্যন্ত সম্ভাবনাময় শিল্পাঞ্চল রূপে উপস্থিত ছিল পশ্চিমবঙ্গের শিল্প মানচিত্রে। এখানকার কারখানাগুলি – আমেরিকান রেফ্রিজেরেটর, মেশিনারি ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি, বেঙ্গল ইনগট, দাস রিপ্রোগ্রাফিক্স, এভেরি, গ্ল্যাক্সও, রোলস মিলস, পোদ্দার প্রজেক্টস, শালিমার টার, রোলস প্রিন্ট, মেটাল বক্স, ওয়েবেল, কেশোরাম কটন, এঞ্জেল ইন্ডিয়া, ফেরিনি, স্টিল এন্ড অ্যালয়েড প্রোডাক্টস, এপিজে ইন্ডিয়া, মাহিন্দ্রা এন্ড মাহিন্দ্রা, অ্যালকন, ইউনিভার্সাল অটোক্র্যাফ্ট প্রভৃতি।

বেলেঘাটা – ফুলবাগান – কাঁকুড়গাছি – ল্যাম্প ফ্যাক্টরি, করাত কল, বোর্ড মিল, স্মল ইঞ্জিনিয়ারিং, কোলে বিস্কুট, বালি জুট মিল, মন্ডল রাবার, গোবিন্দ সিট্ মেটালস, কেদার রাবার, ক্যালকাটা জুট মিল, টাটা অয়েল মিল, সন্তোষ বিস্কুট, স্মল টুলস ম্যানুফ্যাকচারিং ইত্যাদি।
সব কারখানা – সব বন্ধ। মূলত শ্রমিকশ্রেণীর নিজস্ব সরকারের উদাসীনতা ও অপদার্থতায় – পশ্চিমবঙ্গ ক্রমশ রূপান্তরিত হয়েছে জানা-অজানা মালিকশ্রেণীর পুঁজি লুঠ ও ট্রেড ইউনিয়নের নামে এক নতুন ব্যবসার। বকেয়া না পেয়ে, সংসার চালাতে অক্ষম হয়ে কত শ্রমিক আত্মহত্যা করল, মেটাল, রাবার ফ্যাক্টরির প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিক সব হারিয়ে বাজারের চা বা ফুল বিক্রেতায় রূপান্তরিত হল, অভাবের তাড়নায় ও সামান্য টাকার জন্য কত সৎ, আত্মনির্ভরশীল শ্রমিক পরিবারের নারীরা রাতের অন্ধকারে বিকিয়ে যেতে বাধ্য হলেন তার কোনও হিসেবে রইল না। পুঁথিগত শ্রমিক দরদী বামপন্থীরা কার্যত দালালে পরিণত হলেন।

কিন্তু এতদ্সত্বেও কম্যুনিস্ট লাল ঝান্ডা ঊর্ধে উড্ডীন করে আন্তর্জাতিক, ” জাগো জাগো জাগো সর্বহারা অনশন বন্দী ক্রিতদাস শ্রমিক দিয়াছে আজি সাড়া উঠিয়াছে মুক্তির আশ্বাস…….” গাইতে ও বজ্রমুষ্টি সহ “দুনিয়ার মজদুর এক হও” বলে লাল সেলাম ঠুকতে বলতে বিরাম হয়নি প্রতি মে দিবসে। সমস্যা হল কবে যে লাল সেলাম বিখ্যাত কৌতুক ‘সামনে লেনিন, পেছনে হোচিমিন, যা পড়ুন গুছিয়ে নিন’ এ পরিণত হল, কারখানার মালিক পুঁজি নিয়ে প্রস্থান করলেন, বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ হিসাবের টাকা বুঝে classless society গড়তে গিয়ে class enemy হয়ে উঠলেন তা বঞ্চিত, অভুক্ত ও অসহায় শ্রমিকরা বুঝতে পারেননি।
পরিশেষে, এ প্রসঙ্গে রাজ্য সরকারের আইনি ক্ষমতা কতটা আছে দেখা যাক।

West Bengal & Reforms Act (পশ্চিমবঙ্গ ভূমি সংস্কার আইন) অনুসারে, সরকার যে জমি lease এ শিল্প গড়তে সংশ্লিষ্ট কোন মালিককে দিয়েছেন, সেই জমিতে গড়ে ওঠা কোন শিল্পও সংস্থা যদি দীর্ঘকাল বন্ধ থাকে বা কেউ যদি শিল্প গড়ার জন্য নিয়ে জমিটি আটকে রাখেন বা সেই জমিতে নির্ধারিত শিল্পের স্থানে অন্য কিছু করে জমির চরিত্র বদল বা হস্তান্তর করার চেষ্টা করেন, তবে এই আইন অনুযায়ী রাজ্য সরকার সেই জমি পুনরায় অধিগ্রহণ (Resume) করতে পারেন। কিন্তু বামফ্রন্ট বা তৃণমূল আমলে এইপ্রকার প্রত্যাশিত ন্যায়স্থাপন কতবার হয়েছে? উত্তর – এক অপার নিস্তব্ধতা।

মহারাষ্ট্রের মতো প্রথম শ্রেণীর শিল্পোন্নত রাজ্যে শ্রমিক ছাঁটাই বা শ্রম বিরোধে শ্রম আদালতে গিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ, স্থগিতাদেশ পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে, PULP বা Prevention of Unfair Labor Practice – এর মতো আইনের সৌজন্যে, যার রচয়িতা ছিল তথাকথিত শ্রেণীশত্রু বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলগুলি। কিন্তু গত প্রায় ৪৩ বছরে বামফ্রন্ট বা অতি বাম তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে রয়ে গেছে অধরা।

তাহলে পরিত্রাণ কিসে? ১৯৬৭ সালের মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে আসীন হয় অজয় মুখার্জির নেতৃত্বাধীন, বিভিন্ন বামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠন বিশিষ্ট যুক্তফ্রন্ট। প্রথম থেকেই একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল যে ন্যায়সঙ্গত শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশ হস্তক্ষেপ করবে না। এবং কোন শ্রম বিরোধে পুলিশের আগে হস্তক্ষেপ করবে শ্রম দফতর। যার ফলে ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই প্রায় ১, ০১৬টি ঘেরাও ঘটেছিল। এই প্রকার শ্রম আন্দোলন এমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে শব্দটি কালক্রমে English Dictionary তেও স্থান পায়। অর্থ – A protest in which a building or person is surrounded by people until demands are met…..এবং সেই শুরু পশ্চিমবঙ্গের সমাজের সর্বক্ষেত্রে মতোই শিল্প মানচিত্রে অবনমনের।

পুঁজির পলায়ন, মালিকের মুনাফা, ট্রেড ইউনিয়ন ব্যবসা ও সরকারি অপদার্থতার নাগপাশ থেকে পশ্চিমবঙ্গ নিষ্কৃতি পায়নি এখনও। শোনা যায়, বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু তা রয়ে যায় শুধু প্রতিশ্রুতিতেই। মধ্যিখানে পশ্চিমবঙ্গে ১৫০০ একর জমি না পেয়ে পূর্ণেন্দু চ্যাটার্জির নেতৃত্বাধীন হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস (এইচপিএল) পরিশোধনাগার তৈরি করতে ২৮,৭০০ কোটি টাকা লগ্নি করে পার্শ্ববর্তী ওড়িশায়। পরিত্রাণ পেতে হলে স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গীসহ দেশাত্মবোধে উদ্দীপ্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রয়োজন।
সুখের কথা একটিই, মে দিবস পালনের সংখ্যা ক্রমশ কমছে পশ্চিমবঙ্গে।

অনিমিত্র চক্রবর্তী: কোলে বিস্কুট। এই নামটির সঙ্গে বর্তমান বাঙালির পরিচয় না থাকলেও, একসময় তার সঙ্গে ওতপ্রোত পরিচয়...

Address

Kolkata
700001

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when West Bengal Industry posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share

Category