11/05/2026
একদিন অপরাহ্নে নবদ্বীপের সমাজবাড়িতে ললিতা দিদি নিজ কক্ষের সম্মুখস্থ বারান্দায় বসে ,কয়েকজন ভক্তসঙ্গে ভগবৎ প্রসঙ্গ আলোচনা করছিলেন।
এমন সময় খড়দহের প্রভুপাদ শ্রীজীবেন্দ্র মোহন গোস্বামীজী সহ আরও কয়েকজন সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। দিদি শশব্যস্তে উঠে ওনাদেরকে আসন দিয়ে ,শ্রীঅঙ্গের কুশল জিজ্ঞাসা করলে ,
প্রভুপাদ সংক্ষেপে উত্তর দিয়ে বললেন__ সখীদিদি ! আপনার কাছে একটা বিষয়ে নিঃসন্দেহ হতে এসেছি। নিঃসঙ্কোচে বলবেন তো??
দিদি __ আমি এমন কি জানি প্রভু , যা আপনাকে বলে আপনার সন্দেহ ভঞ্জন করবো!!
প্রভুপাদ __ আজ কোন শাস্ত্র সিদ্ধান্ত শুনতে আসিনি দিদি । বিষয়টি হচ্ছে নবদ্বীপে হরিসভায় ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন মহাশয়ের প্রতিমূর্তি প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধে। এই মূর্তিটি নিয়ে কেবল নবদ্বীপেই নয় সমগ্র বৈষ্ণবমহলেই বাগ্বিতন্ডার সৃষ্টি হয়েছে। এই মূর্তিটিকে , নাকি অশাস্ত্রীয় ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে!! আমি শিতিকন্ঠ বাচস্পতির নিকট হতে কিছু কিছু শুনেছি তবে আপনার কাছে এই ঘটনার ইতিবৃত্ত জানতে এসেছি।
দিদি __ আমি তো স্বচক্ষে কিছু দেখিনি প্রভু ! তবে যেভাবে শোনা আছে তা হল __ হরিসভা নাম হয় অনেক পরে , ওটা ছিল মথুরানাথ পদরত্ন মহাশয়ের টোলবাড়ি। ঐখানেই নেহাল ক্ষ্যাপার ভবিষ্যৎ নির্দেশমত এক শুভক্ষণে ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন মহাশয় দ্বারা শ্রীশ্রীমন্মহাপ্রভুর শ্রীমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর ঐ টোলবাড়ির নাম হরিসভা হয়।
মহাপ্রভুর শ্রীমূর্তি প্রতিষ্ঠার পর পাঁচ -ছ বছর ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন মহাশয় পুত্র মথুরানাথের সাহচর্যে খুব আনন্দের সঙ্গেই প্রভুর সেবা করছিলেন ।
একদিন অপরাহ্নে নামের মালা হাতে নিয়ে বিদ্যারত্ন মহাশয় নাম করতে করতে হরিসভার চতুর্দিক ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। সেই সময় একটি ঘরের মধ্যে নিজের একটি প্রতিমূর্তি দেখে পুত্র মথুরানাথকে জিজ্ঞাসা করলেন ___" মথুর ! এ মূর্তি এখানে কোত্থেকে এলো??
মথুরানাথ বিনীতভাবে বললেন ___ " একটি ভালো কারিগর পেয়েছিলাম , তাকে দিয়েই আমি ওটি তৈরি করিয়ে রেখেছি।"
বিদ্যারত্ন মহাশয় শুনে গম্ভীরভাবে একটু সময় কী যেন চিন্তা করলেন । তারপর বললেন ___ " তুমি তো শাস্ত্র পড়েছো মথুর ! তুমি কি জানো না যে কোন মূর্তি অপ্রতিষ্ঠিত অবস্থায় ঘরে রাখতে নেই ! সেই দিন এই পর্যন্ত, আর কিছু না বলে চলে গেলেন।
প্রায় ১৬/১৭ দিন পর আবার বিদ্যারত্ন মহাশয় সেই ঘরের কাছে গিয়ে দেখেন যে ___ মূর্তিটিকে সেখান থেকে সরানো বা অন্য কোন ব্যবস্থা করা হয় নি। তিনি পুত্রকে ডেকে একটু ক্রুদ্ধভাবেই বললেন ____ " যদি একান্তই তুমি আমার এ মূর্তি এখানে রাখতে চাও , তাহলে যত শ্রীঘ্রই সম্ভব যথাবিধি প্রতিষ্ঠা করে তবে রাখ।"
পিতৃদেবের আদেশ শ্রবণ করে , আনন্দে মথুরানাথের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগলো। কেন না তার মনোবাসনা পিতৃদেব পূরণ করে দিলেন।
মথুরানাথ একটি ভালো দিন দেখে যথাবিধি পূজার্চ্চনাদি করে মূর্তিটি শ্রীমন্মহাপ্রভুর পাদপীঠের পার্শ্বে স্বতন্ত্র আসনে স্থাপন করলেন।
প্রতিষ্ঠাকার্য সম্পন্ন করে পিতৃদেবকে সংবাদটি জানাতে ও প্রণাম করতে গিয়ে দেখেন ___ পিতৃদেব তার ঘরে আসনের ওপর স্থিরভাবে বসে আছেন। হাতে শ্রীনামের মালা , নয়ন উন্মীলিত। মথুরানাথ কিছু সময় জোরহাতে অপেক্ষা করে থেকেও যখন কোনরূপ সাড়া পেলেন না, তখন কাছে এগিয়ে গিয়ে বিশেষভাবে লক্ষ্য করে দেখেন যে , তার পিতার দেহে কোনরূপ স্পন্দন নেই , নয়নতারাও স্থির ।
অবস্থা দেখে বোঝা গেল , প্রতিমূর্তি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই বিদ্যারত্ন এ নশ্বর দেহ ত্যাগ করে নিত্যলীলায় প্রবেশ করেছেন। এখনও পর্যন্ত হরিসভায় শ্রীমন্মহাপ্রভুর পাদপীঠের একপার্শ্বে থেকে মথুরানাথের কীর্তি ভক্তগণকে আনন্দ দিচ্ছে।
প্রভুপাদ ___ আচ্ছা দিদি! এভাবে মূর্তি প্রতিষ্ঠা এবং তার সেবা করা ,আপনি সমর্থন করেন কি??
দিদি ____ প্রভু! আমার ব্যক্তিগত সমর্থনে অসমর্থনে কি আসে যায়। তবে একটা কথা আমার মনে হচ্ছে ,যদি অভয় দেন তাহলে বলি।
প্রভুপাদ ___ আপনি তো জানেন দিদি , আপনার সিদ্ধান্ত আর কেউ না নিলেও আমি নেবই। তাই আপনি নির্ভয়ে আপনার প্রাণের কথা খুলে বলুন।
দিদি ____ যার কৃপায় , মথুরানাথ সাক্ষাৎ শ্রীগৌরসুন্দরের সেবা করবার সুযোগ পেলো , তার পূজা করা কি অন্যায়??
তারপর অন্য দিক দিয়েও তো বিদ্যারত্ন মহাশয় , মথুরানাথের জন্মদাতা পিতা এবং শাস্ত্রজ্ঞানদাতা গুরু। সে অবস্থায় যদি মথুরানাথ পিতৃদেবের প্রতিমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেই থাকেন ,তাতে এমন কি দোষ হয়েছে বুঝি না।
এছাড়াও বিদ্যারত্ন মহাশয় যখন মূর্তি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই নিজ দেহ ত্যাগ করলেন । তখন আর কি দোষের কিছু রইলো! তবে আপনাদের শাস্ত্রে কি আছে আপনারাই জানান।
প্রভুপাদ ___ না দিদি! আর শাস্ত্রের কথা তুলে মন চঞ্চল করে দেবেন না। আপনার যুক্তিপূর্ণ সিদ্ধান্তই আমার কাছে যথেষ্ট।
এই কথা বলে প্রভুপাদ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন ___ "আজ আসি দিদি, যদি থাকা হয় তবে আর একদিন আসবো।
(বন্ধুগোপী দাদার লেখনী থেকে)
ছবিতে: শ্রীশ্রী পন্ডিত ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন মহাশয়
অঙ্গরাগ সেবায়: শ্রী অর্ক দাস